বিয়ের আশ্বাসে প্রেমিকাকে ধর্ষণ: সেই প্রেমিকের আমৃত্যু কারাদণ্ড
রাজধানীর কাফরুল এলাকায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রেমিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে এক যুবককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে সাজা পরোয়ানা জারি করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
দণ্ডপ্রাপ্ত ওই যুবকের নাম মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (৩২)। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, আসামির মালিকানাধীন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে জরিমানার অর্থ আদায় করতে হবে এবং সেই অর্থ ভুক্তভোগী নারীকে প্রদান করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদালত ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়-কে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভুক্তভোগী নারীর সন্তানের বয়স ২১ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার যাবতীয় ভরণপোষণের ব্যয় আসামির সম্পত্তি থেকে বহন করতে হবে। যদি আসামির সম্পত্তি পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে রাষ্ট্রকে সেই দায়ভার গ্রহণ করতে হবে বলেও নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
মামলার এজাহার ও আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ভুক্তভোগী নারীর স্বামী মারা যাওয়ার পর পরিচয়ের সূত্রে জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর ইব্রাহিমপুর এলাকায় প্রথমবার ওই নারীকে ধর্ষণ করেন জাহাঙ্গীর। পরে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তিনি বিভিন্ন সময় ওই নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ভুক্তভোগী নারী বিশ্বাস করে সম্পর্ক চালিয়ে গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারি বিয়ের কথা বলে আবারও ওই নারীকে ধর্ষণ করেন জাহাঙ্গীর। ওই ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। বিষয়টি জানাজানি হলে জাহাঙ্গীর তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে করে ভুক্তভোগী নারী মারাত্মক মানসিক ও সামাজিক সংকটে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি ন্যায়বিচারের আশায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাফরুল থানা-য় একটি মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত চলাকালীন একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ভুক্তভোগী নারী একটি সন্তানের জন্ম দেন। নবজাতকের জন্মের প্রায় দুই সপ্তাহ পর ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে পরীক্ষার ফলাফলে প্রমাণিত হয় যে শিশুটির জৈবিক পিতা আসামি জাহাঙ্গীর হোসেন। এই ডিএনএ পরীক্ষার ফল মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এবং কাফরুল থানার উপপরিদর্শক আকলিমা আক্তার দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ২৫ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন আদালতে মোট পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের বক্তব্য, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত মনে করেন, আসামি পরিকল্পিতভাবে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ওই নারীকে প্রতারণা ও যৌন নির্যাতনের শিকার করেছেন। তাই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. এরশাদ আলম (জর্জ) সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আদালত সব দিক বিবেচনা করে একটি দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়েছেন। তিনি জানান, পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং প্রমাণাদি বিশ্লেষণের পর আদালত এই রায় ঘোষণা করেছেন। তার মতে, এ ধরনের রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সমাজে একটি শক্ত বার্তা দেবে যে, নারীর প্রতি সহিংসতা ও প্রতারণামূলক যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর অবস্থান রয়েছে।
আইনজীবীরা মনে করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী নারী ও তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেও আদালত গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে সন্তানের বয়স ২১ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ভরণপোষণের দায়িত্ব আসামির সম্পত্তি থেকে দেওয়ার নির্দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে ভুক্তভোগী নারী ও তার সন্তান ন্যায়বিচার পাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তারও সুযোগ পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
