দাম কমিয়ে নতুন করে তেলের দাম নির্ধারণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে টানাপোড়েনের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দামে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। শুক্রবার (২০ মার্চ) ভোরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য কমে আসে, যা বিনিয়োগকারী ও ভোক্তাদের জন্য এক ধরনের ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈশ্বিক মানদণ্ড Brent Crude-এর দাম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে মার্কিন মানদণ্ড WTI বা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৯৪ দশমিক ৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ায় বাজারে স্বল্পমেয়াদে চাপ কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে তেলের দামে। বিশেষ করে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরে এসেছে। তবে এই স্বস্তি যে দীর্ঘস্থায়ী হবে, এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক Goldman Sachs ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, বর্তমান উচ্চমূল্যের প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষকরা বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) প্রকাশিত এক নোটে উল্লেখ করেছেন, অতীতের বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতির অভিজ্ঞতা বলছে—যদি দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন বা বড় ধরনের ক্ষতি ঘটে, তাহলে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে স্থায়ী হতে পারে এবং এই অবস্থা ২০২৭ সাল পর্যন্তও চলতে পারে। এই পূর্বাভাস বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, কারণ উচ্চ জ্বালানি মূল্য সাধারণত উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করে।
এদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনও তেলের দামে প্রভাব ফেলছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu যখন জানান যে তারা ইরানের প্রধান জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পুনরায় হামলা না চালানোর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর আহ্বানে সাড়া দিতে প্রস্তুত, তখন বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। এই ঘোষণার ফলে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা সাময়িকভাবে কমে যায়, যা তেলের দামে পতনের একটি কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
উল্লেখ্য, এর আগে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করলে তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। বিশেষ করে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র South Pars Gas Field-এ ইসরায়েলি হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। এর জবাবে ইরান কাতারের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্র Ras Laffan Industrial City-এ পাল্টা হামলা চালালে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। ওই সময় তেলের দাম হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যায়, যা বাজারের অস্থিরতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দামে সাময়িক পতন দেখা গেলেও বাজার এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপ বা রাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও দামের ঊর্ধ্বগতির কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, উৎপাদন কমে যাওয়া কিংবা পরিবহন ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলে তেলের দাম দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে। যদিও সাময়িকভাবে তেলের দাম কিছুটা কমেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থিতিশীল থাকবে কিনা তা অনেকটাই নির্ভর করছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতার ওপর।
