ইরানে হামলায় ইসরায়েলের খরচ ৭৭ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা

 


ইরানে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে প্রথম ২০ দিনেই ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ব্যয় বিপুল পরিমাণে বেড়ে প্রায় ৬৪০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে Haaretz। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৭ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকার সমান, যা সাম্প্রতিক বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার অনুযায়ী হিসাব করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এত স্বল্প সময়ে এমন ব্যয় বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সংঘাতের আর্থিক চাপ কতটা গভীর হতে পারে, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়কালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ কোটি শেকেল, অর্থাৎ আনুমানিক ৩২ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। প্রতিদিনের এই বিপুল ব্যয় সামরিক অভিযান পরিচালনা, অস্ত্র সরবরাহ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখা এবং লজিস্টিক সহায়তার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বহন করা যে কোনো দেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।


ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর জন্য নির্ধারিত মোট বাজেট প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি শেকেল, যা ডলারে প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি। বর্তমান ব্যয়ের হারে এই বাজেট কতদিন টিকবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই ব্যয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। ফলে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।


প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে যে, সেনাবাহিনী অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সরকারকে নতুন বাজেট বরাদ্দের অনুরোধ জানাতে পারে। ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের ঘাটতির খবর সামনে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে জরুরি নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য ইসরাইল সরকার রোববার ৮২৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ বাজেট অনুমোদন করেছে।


এদিকে Channel 12-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে তেল আবিব তাদের ২০২৬ সালের জাতীয় বাজেট পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে পারে। অর্থাৎ সামরিক ব্যয় মেটাতে অন্যান্য খাতের বাজেটে কাটছাঁট বা পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।


সংঘাতের আর্থিক প্রভাব শুধু ইসরাইলেই সীমাবদ্ধ নয়, যুক্তরাষ্ট্রও এতে বড় অঙ্কের ব্যয় বহন করছে। হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা Kevin Hassett জানিয়েছেন, সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এটি মিত্র দেশ হিসেবে ইসরাইলকে সহায়তা এবং যৌথ সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার অংশ হিসেবেই ব্যয় করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


এছাড়া মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর Pentagon হোয়াইট হাউসের কাছে আরও ২০০ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্পূরক অর্থায়ন প্যাকেজ অনুমোদনের অনুরোধ জানিয়েছে, যা কংগ্রেসে পেশ করা হতে পারে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ অনুমোদিত হলে তা সামরিক ব্যয়ের নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করার সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।


উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।


এই সংঘাতের মানবিক দিকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিপুল পরিমাণ সামরিক ব্যয়, অস্ত্রের ব্যবহার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চাপ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ব্যয়ের পরিমাণ তত বাড়বে এবং তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।


সব মিলিয়ে, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান এই সংঘাত শুধু সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ব্যয় এবং সম্ভাব্য নতুন অর্থায়নের পরিকল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই সংঘাত সহজে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।


সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর।

Next Post Previous Post

মন্তব্য করুন