চার শতকের সাক্ষী ফেনীর ঐতিহাসিক চাঁদগাজী ভূঁইয়া মসজিদ

 


ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলামহামায়া ইউনিয়নের মাটিয়াগোধা গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক চাঁদগাজী ভূঁইয়া জামে মসজিদ প্রায় চার শতাব্দী ধরে অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের অনন্য সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। মোগল সাম্রাজ্য আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অতীত ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবেও বিবেচিত। প্রবেশপথে থাকা শ্বেতপাথরের ফলক ও ফারসি লিপি থেকে জানা যায়, প্রভাবশালী জমিদার চাঁদগাজী ভূঁইয়া ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেন।



 তিনি ঐতিহাসিক বারো ভূঁইয়া বংশের উত্তরসূরি ছিলেন বলে স্থানীয় ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন এবং তৎকালীন সীমান্তবর্তী ত্রিপুরা রাজ্য অঞ্চলে তিনি প্রভাবশালী শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার নাম অনুসারেই আশপাশের এলাকা ও চাঁদগাজী বাজার-এর নামকরণ হয়েছে, যা স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে এই স্থাপনার গভীর সম্পর্ক নির্দেশ করে। স্থাপত্যিক দিক থেকে মসজিদটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত—তিন গম্বুজবিশিষ্ট মূল কাঠামো, প্রায় চার ফুট পুরু দেয়াল, মাঝের বড় গম্বুজ, শীর্ষে কলস ও পাতা নকশা এবং চারপাশে ১২টি ক্ষুদ্র মিনার মিলিয়ে এটি মোগল শিল্পরীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ভেতর ও বাইরের দেয়ালে সূক্ষ্ম ফুল-লতাপাতার টেরাকোটা অলংকরণ প্রাচীন কারুশিল্পের নিপুণতা তুলে ধরে, যা গবেষক ও স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবহেলা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ১৯৮৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করলেও দীর্ঘ তিন দশকে বড় কোনো সংস্কার হয়নি; দেয়ালে শ্যাওলা জমে কালচে হয়ে গেছে, বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং সামনের দিঘীটিও হারিয়েছে তার পুরোনো সৌন্দর্য। স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর মতে, দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিন দর্শনার্থী এলেও ভাঙাচোরা সড়ক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে পারছে না। এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফেনীর উপপরিচালক নাজমুস শাকিব জানান, পুরোনো মসজিদ সংস্কারের জন্য এখনো কোনো সরকারি নির্দেশনা আসেনি; নির্দেশনা এলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে এই ঐতিহাসিক মসজিদ শুধু ধর্মীয় উপাসনার স্থান হিসেবেই নয়, বরং জেলার অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। শতাব্দীপ্রাচীন এই স্থাপত্যের ঐতিহ্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি—কারণ এটি কেবল একটি মসজিদ নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের জীবন্ত দলিল।

Next Post Previous Post

মন্তব্য করুন