যেখানে ১৫০ টাকায় মিলছে নারী শ্রমিক

 


দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় প্রতিদিন ভোর হলেই এক ভিন্ন দৃশ্য চোখে পড়ে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত নারী-পুরুষ এসে জড়ো হন একটি নির্দিষ্ট স্থানে। কারও হাতে কোদাল, কারও কাছে ডালি, আবার কেউ খালি হাতেই বসে থাকেন কাজের আশায়। দিনের শুরুতেই তারা অপেক্ষা করেন—কেউ এসে তাদের শ্রম কিনবে, সেই আশায়।

এই স্থানটি স্থানীয়দের কাছে ‘কামলার হাট’ নামে পরিচিত। উপজেলার আমতলার মোড়েই বসে এই শ্রমিক কেনাবেচার হাট। সোমবার (৩০ মার্চ) সকালেও সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকদের দীর্ঘ সারি। গৃহস্থ বা ঠিকাদাররা এসে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক বেছে নিয়ে যান।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই দিন শেষে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকার বিনিময়ে কাজ করেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেও এত অল্প মজুরি পান তারা। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের সংখ্যা এখানে বেশি, যাদের অনেকেই সনাতন ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের।

তবে কৃষি মৌসুমে চিত্র কিছুটা বদলায়। ধান, ভুট্টা বা আলু রোপণের সময় কাজের চাপ বাড়লে মজুরি বেড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। কিন্তু এই সময়কাল খুবই স্বল্প। বছরের বেশিরভাগ সময় কাজের অভাব থাকে, ফলে শ্রমিকদের আয়ও কমে যায়।

বর্তমানে কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের দুরবস্থা আরও বেড়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় শ্রমিক বেশি হওয়ায় অনেকেই কাজ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন। অনেকের দিন কাটছে অর্ধাহারে বা অনাহারে।

শ্রম বিক্রির জন্য আসা সাধুর বাজার গ্রামের কল্পনা রানী (৬০) জানান, “আমার দুই কিডনির অপারেশন হয়েছে। স্বামীও অসুস্থ। তাই বাধ্য হয়ে কাজে আসি। আমার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, কিন্তু টাকার অভাবে মাস্টার্স করতে পারছে না।”

একইভাবে সুন্দইল গ্রামের দলুয়া রায় (৬২) বলেন, “দুই যুগ ধরে এখানে কাজের জন্য আসি। কোনোদিন কাজ পাই, কোনোদিন পাই না। এখন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মজুরি পাই। এই টাকায় সংসার চালানো খুব কঠিন।”

তিনি আরও বলেন, “এক কেজি মোটা চাল কিনতে লাগে প্রায় ৬০ টাকা, এক লিটার সয়াবিন তেল ২০০ টাকার মতো। এই মজুরিতে আমরা কীভাবে বাঁচব?”

প্রতিদিন আশপাশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই হাটে আসেন শ্রমিকরা। কাজ পেলে তাদের মুখে হাসি ফুটে, আর কাজ না পেলে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়।

জানা গেছে, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই এলাকায় প্রতিদিন এমন শ্রমিকের হাট বসে। পেটের দায়েই তারা এখানে আসেন, জীবিকার সন্ধানে।

নারী শ্রমিকদের অনেকেই এখন সরকারি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন। তারা মনে করেন, এই কার্ড পেলে ন্যূনতম সহায়তা পেয়ে পরিবার নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে থাকতে পারবেন।

তাদের ভাষায়, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য চালু হওয়া এই সহায়তা কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে তারা উপকৃত হবেন। তবে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এখনো সঠিকভাবে কার্ড বিতরণ হয়নি।

সব মিলিয়ে, কাহারোলের এই ‘কামলার হাট’ শুধু শ্রম বিক্রির জায়গা নয়—এটি দেশের দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে প্রতিদিন অল্প টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয় মানুষের শ্রম, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

Next Post Previous Post

মন্তব্য করুন