ফিতরা কাকে দেওয়া যাবে আর কাকে দেওয়া যাবে না? জেনে নিন ইসলামের বিধান
সাদাকাতুল ফিতর: গুরুত্ব, নেসাব এবং বিতরণের শরয়ী বিধান
ইসলামী শরিয়তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি আর্থিক ইবাদত হলো সাদাকাতুল ফিতর। পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতরের আনন্দকে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের সাথে ভাগ করে নেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম এটি। সাদাকাতুল ফিতর মূলত দুটি আরবি শব্দের সমষ্টি। ‘সাদাকা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো দান এবং ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ হলো রোজা ভঙ্গকরণ বা উন্মুক্তকরণ। দীর্ঘ এক মাস সংযম পালনের পর যেহেতু রোজা সমাপ্ত করা হয় এবং এই উপলক্ষে শরিয়ত নির্ধারিত দান অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়, তাই একে সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়। এটি কেবল একটি দান নয়, বরং রোজার ভুলত্রুটি মার্জনা এবং দরিদ্রদের মুখে হাসি ফোটানোর একটি পবিত্র প্রক্রিয়া।
সাদাকাতুল ফিতর কাদের ওপর ওয়াজিব?
সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ওয়াজিব। ঈদুল ফিতরের দিন অর্থাৎ ১ শাওয়াল সুবহে সাদেকের সময় যদি কোনো মুসলিম নর-নারী তার মৌলিক প্রয়োজন ও নিত্যব্যবহার্য আসবাবপত্রের বাইরে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তার ওপর ফিতরা প্রদান করা বাধ্যতামূলক।
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, সাদাকাতুল ফিতরের নেসাব হলো— সাড়ে বায়ান্ন তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম) রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ টাকা বা পণ্য। নেসাব গণনার ক্ষেত্রে কেবল নগদ টাকা বা সোনা-রুপা নয়, বরং ব্যবসায়িক পণ্য, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, অতিরিক্ত বাড়ি এবং অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের মূল্যও হিসাব করতে হবে। নাবালেগ সন্তান বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির যদি নিজস্ব সম্পদ থাকে, তবে তার অভিভাবক সেই সম্পদ থেকে ফিতরা আদায় করবেন। (রদ্দুল মুহতার: ২/৩৫৯)।
ফিতরা বিতরণের খাত: কাকে দেওয়া যাবে?
সাদাকাতুল ফিতর কাকে দেওয়া যাবে, তা নিয়ে অনেক সময় সাধারণ মুসুল্লিদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতি হলো— যাকাত গ্রহণের যোগ্য ব্যক্তিরাই ফিতরা পাওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ, যাদের যাকাত দেওয়া জায়েজ, তাদেরকেই ফিতরা দেওয়া যাবে। পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা যাকাত ও সদকার ৮টি খাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন:
১. ফকির: যার কিছু সম্পদ আছে কিন্তু তা নেসাব পরিমাণ নয়। ২. মিসকিন: যার কাছে একেবারেই কিছু নেই, অত্যন্ত নিঃস্ব ও অসহায়। ৩. আমিল: ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারী (বর্তমানে এর প্রচলন নেই)। ৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব: ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য নবদীক্ষিত মুসলিমদের সহায়তা (বর্তমানে আলেমদের মতে এর আবশ্যকতা নেই)। ৫. দাসমুক্তি: বর্তমানে এই প্রথা বিলুপ্ত। ৬. ঋণগ্রস্ত: যার ওপর ঋণের বোঝা আছে এবং নিজের সম্পদ দিয়ে তা পরিশোধ করতে অক্ষম। ৭. ফী-সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে): দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত ব্যক্তি বা দ্বীনি শিক্ষা অর্জনকারী দরিদ্র শিক্ষার্থী। ৮. মুসাফির: কোনো ব্যক্তি সফরে থাকাকালীন যদি নিঃস্ব হয়ে পড়ে, তবে তার নিজ দেশে সম্পদ থাকলেও তাকে ফিতরা দেওয়া যাবে।
যাদের ফিতরা দেওয়া বৈধ নয়
সাদাকাতুল ফিতর প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। ভুল পাত্রে ফিতরা দিলে তা আদায় হবে না। শরিয়ত অনুযায়ী নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের ফিতরা দেওয়া যাবে না:
নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক: যার কাছে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার মতো সম্পদ আছে, তিনি ফিতরা নিতে পারবেন না।
উর্ধ্বতন ও অধস্তন বংশধর: নিজের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানিকে ফিতরা দেওয়া যাবে না, কারণ তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব সন্তানের ওপর অর্পিত। একইভাবে নিজের সন্তান, নাতি-নাতনিকেও ফিতরা দেওয়া বৈধ নয়।
দম্পতি: স্বামী তার স্ত্রীকে এবং স্ত্রী তার স্বামীকে ফিতরা দিতে পারবেন না।
রাসূল (সা.)-এর বংশধর: বনু হাশেম বা সৈয়দ বংশের লোকদের জন্য যাকাত ও ফিতরা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ।
অমুসলিম: ফিতরা কেবল মুসলিমদের প্রাপ্য। তবে অমুসলিমদের সাধারণ দান বা নফল সাদাকা দেওয়া যেতে পারে।
অবকাঠামো নির্মাণ: যাকাত বা ফিতরার টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, রাস্তাঘাট মেরামত, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন বা মাহফিলের খরচ মেটানো জায়েজ নয়। এই টাকা সরাসরি অভাবী মানুষের হাতে মালিকানাস্বরূপ তুলে দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজযাক: ৬৯৪৭, রদ্দুল মুহতার: ২/৩৩৯)।
উপসংহার
সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের মাধ্যমে রোজাদার তার সিয়ামের পূর্ণতা অর্জন করেন। এটি একদিকে যেমন বিত্তবানদের সম্পদে দরিদ্রের অধিকার নিশ্চিত করে, অন্যদিকে সমাজের শ্রেণিবিভেদ কমিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে। তাই নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সঠিক সময়ে এবং সঠিক খাতে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা, যাতে অসহায় মানুষগুলো ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে।
