কলার মোচা দেখিয়ে ট্রেন থামালেন বৃদ্ধ, বাঁচল শত শত প্রাণ!


দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় এক হৃদয়স্পর্শী ও সাহসিকতাপূর্ণ ঘটনায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে শত শত যাত্রী। জীবন বাজি রেখে একাই ট্রেন থামিয়ে দেন ৬৫ বছর বয়সী দিনমজুর এনামুল হক। লাঠির মাথায় কলার মোচার লাল পাপড়ি বেঁধে তৈরি করেন অস্থায়ী বিপদ সংকেত, যা দেখে থেমে যায় দ্রুতগতিতে ছুটে আসা আন্তঃনগর পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন। তার এই উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতায় নিশ্চিত বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

সোমবার (২৩ মার্চ) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলপথের ৩৫২/৫ থেকে ৩৫২/৬ কিলোমিটারের মাঝামাঝি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ব চন্ডিপুর গ্রামের বাসিন্দা এনামুল হক প্রতিদিনের মতো সকালে কাজের উদ্দেশ্যে রেললাইন ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি দেখতে পান রেললাইনের একটি অংশ প্রায় এক ফুট ভেঙে গেছে, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথমে আশপাশের লোকজনকে বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলেন তিনি। কিন্তু সময় খুব কম থাকায় এবং যেকোনো মুহূর্তে ট্রেন চলে আসতে পারে—এই আশঙ্কায় নিজেই ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পাশের একটি কলাবাগান থেকে একটি কলার মোচা এনে তার লাল পাপড়ি লাঠির সঙ্গে বেঁধে তৈরি করেন একটি সতর্ক সংকেত। এরপর জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তিনি রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে সেই সংকেত দেখাতে থাকেন, যাতে ট্রেন চালক দূর থেকেই বিপদের বিষয়টি বুঝতে পারেন।

তার এই সাহসী উদ্যোগের মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড়গামী আন্তঃনগর পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ট্রেনের চালক দূর থেকে লাল সংকেত দেখে দ্রুত পরিস্থিতি অনুধাবন করেন এবং জরুরি ব্রেক কষে ট্রেনটি থামিয়ে দেন। ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পায় ট্রেনের শত শত যাত্রী।

এদিকে এনামুল হকের ছেলে শাহিনুর রহমান দ্রুত পার্বতীপুর রেলওয়ে অফিসে ফোন করে বিষয়টি জানালে কর্তৃপক্ষ তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেয়। প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই প্রকৌশলী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভাঙা রেললাইন মেরামতের কাজ সম্পন্ন করে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি আবার তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

ঘটনার পর এনামুল হকের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি কাজের সন্ধানে ফরিদপুরে চলে গেছেন। তবে তার এই সাহসিকতার গল্প ইতোমধ্যেই স্থানীয়দের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। একজন সাধারণ দিনমজুর হয়েও যে এত বড় দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার পরিচয় দেওয়া যায়, তা তিনি প্রমাণ করেছেন।

ফুলবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার শওকত আলী জানান, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রেললাইন ভাঙার খবর পাওয়ার পর দ্রুত প্রকৌশলী দল পাঠানো হয় এবং মেরামতের কাজ শেষ হওয়ার পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে এই সময় প্রায় ৪৫ মিনিট রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটিও আটকা পড়ে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয়দের সচেতনতা এবং বিশেষ করে এনামুল হকের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের কারণেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

সব মিলিয়ে, এই ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা এড়ানোর গল্প নয়, বরং এটি মানবিকতা, সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এনামুল হকের মতো সাধারণ মানুষের অসাধারণ এই কাজ সমাজে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে এবং প্রমাণ করবে—সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে বড় বিপদ থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

Next Post Previous Post

মন্তব্য করুন