আমি কোরআনের ভুল ধরতে গিয়ে এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছি শেষ পর্যন্ত যা বললেন:গাজী রাকায়েত
অভিনয়, নির্মাণ ও লেখনী—এই তিন অঙ্গনেই নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে যিনি হয়ে উঠেছেন অনন্য, তিনি গাজী রাকায়েত। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে পূর্ণদৈর্ঘ্য—সব জায়গাতেই তার সৃজনশীলতার বিচরণ। অল্প কাজ করেও যার ঝুলিতে জমা হয়েছে ২৮টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, তার সাফল্যের গল্প অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার। তবে এই সাফল্যের ঝলমলে আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম, বিশ্বাসের ভাঙাগড়া, প্রশ্ন আর আত্মসংঘাতের দীর্ঘ পথচলা।
এক সময় নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়েই সংশয়ে পড়ে যান তিনি। শুধু সংশয়ই নয়, একপর্যায়ে ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেকে একধরনের অবিশ্বাসের জায়গায় দাঁড় করান। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে ব্যক্তিগত শোক তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। সেই সময়ের মানসিক অবস্থাকে তিনি নিজেই বলেছেন এক ধরনের “মৃত্যুযন্ত্রণা”। প্রিয় এক ভাগ্নের মৃত্যু তাকে গভীরভাবে আঘাত করে, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম নিয়ে তার ক্ষোভ।
এই ক্ষোভ এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি একসময় নামাজ পড়া ছেড়ে দেন। নিজের বিশ্বাস নিয়েই প্রশ্ন তোলেন—কেন সৃষ্টি, কেন মৃত্যু, কেন এই জীবনচক্র? তিনি বলেন, “আল্লাহ যদি আমাকে সৃষ্টি করেন, তবে কেন আমাকে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যেতে হবে?”—এই প্রশ্নগুলোই তাকে ধীরে ধীরে এক ভিন্ন চিন্তার জগতে নিয়ে যায়।
এই সময় তিনি বিজ্ঞানের নানা বিষয়, বিশেষ করে আইনস্টাইন ও স্টিফেন হকিংয়ের লেখা পড়তে শুরু করেন। “থিওরি অব রিলেটিভিটি” থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের জটিল ব্যাখ্যা—সবকিছু তাকে আকৃষ্ট করে। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে একজন নাস্তিক হিসেবেই ভাবতে শুরু করেন। তার নিজের ভাষায়, “স্টিফেন হকিং পড়েই আমি এথিস্ট হয়ে গিয়েছিলাম।”
তবে এখানেই শেষ হয়নি তার গল্প। বরং এখান থেকেই শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের যাত্রা। একসময় তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন—তিনি আসলে নিজের ধর্ম সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। পরিবার মুসলিম, চারপাশ মুসলিম, কিন্তু নিজে কতটুকু জেনেছেন? এই প্রশ্নই তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
এই ভাবনা থেকেই তিনি কোরআন পড়া শুরু করেন, তবে ভিন্ন উদ্দেশ্যে। তিনি নিজেই বলেন, “আমি কোরআনের সায়েন্টিফিক ভুল ধরতে গিয়েছিলাম।” কিন্তু এই অনুসন্ধান তাকে নিয়ে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপলব্ধিতে। ভুল খুঁজতে গিয়ে তিনি বরং কোরআনের ভাষা, গঠন ও ভাবনায় মুগ্ধ হয়ে পড়েন।
তার মতে, মানুষ যত জ্ঞানীই হোক, তার জ্ঞানের সীমা আছে। তিনি বলেন, “তুমি ৯৯ পর্যন্ত যেতে পারবা, কিন্তু ১০০ হতে পারবা না।” আর সেই ‘এক’—যেটা মানুষ পূরণ করতে পারে না—সেটাকেই তিনি আল্লাহ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার বিশ্বাস, এই ‘এক’কে স্বীকার করার পর থেকেই তার জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
তিনি আরও বলেন, ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং পুরো মানবজাতির জন্য এসেছে। কোরআনের গঠন, ভাষা ও এর ভেতরের সংখ্যাগত বিন্যাস নিয়ে তিনি বিশেষভাবে কথা বলেন। তার দাবি, কোরআনের প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার সম্পর্ক রয়েছে, যা এক ধরনের ‘প্রফেসি নাম্বার’ হিসেবে কাজ করে।
তিনি এমনও বলেন, “মানুষ ও জিন একসাথে চেষ্টা করলেও কোরআনের মতো একটি বই তৈরি করতে পারবে না।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কোরআনের অতুলনীয়তা তুলে ধরেন।
একটি সময় তিনি নিজেই চেষ্টা করেছিলেন কোরআনের মতো কিছু তৈরি করতে। প্রায় ১৫ দিন চেষ্টা চালানোর পর তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার মতে, এটি মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এই অভিজ্ঞতাই তাকে আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী করে তোলে।
তিনি উদাহরণ টানেন সূর্য-চন্দ্রের কক্ষপথ নিয়ে। আধুনিক বিজ্ঞান যেটা অনেক পরে আবিষ্কার করেছে, কোরআনে সেটির উল্লেখ বহু আগে থেকেই আছে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, এটি প্রমাণ করে যে কোরআন কোনো সাধারণ মানুষের লেখা নয়।
এছাড়া জীবনের বিপদ-আপদ নিয়েও তিনি কোরআনের উদ্ধৃতি দেন। তার মতে, মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটে, তা পূর্বনির্ধারিত—এবং এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে।
সবশেষে তিনি এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন—বিশ্বের সেরা গণিতবিদদের উদ্দেশ্যে। তার বক্তব্য, কোরআনের গাণিতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে কেউ যদি এর মতো কিছু তৈরি করতে পারে, তবে তিনি তা দেখতে চান। তবে তার দৃঢ় বিশ্বাস, এটি সম্ভব নয়।
গাজী রাকায়েতের এই যাত্রা শুধু একজন শিল্পীর নয়, বরং একজন মানুষের ভেতরের পরিবর্তনের গল্প। সংশয় থেকে বিশ্বাস, অন্ধকার থেকে আলো—এই পথচলাই তাকে আজ নতুনভাবে পরিচিত করেছে। তার এই অভিজ্ঞতা এখন অনেকের কাছেই চিন্তার খোরাক, আবার অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
