ইসরায়েলকে যুদ্ধ শেষ করার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিল আমেরিকা

 


ইরান-এর বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয় বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহলের একটি সূত্র। একটি প্রতিবেদনে ওই সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তেহরানে শাসন পরিবর্তন ঘটাতে হলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান অথবা দেশের ভেতরে ব্যাপক গণবিক্ষোভের পুনরুত্থান প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুইটির কোনোটিই বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত শেষ করতে ইসরায়েল-কে এক সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Middle East Eye একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের জন্য কেবল বিমান হামলা বা সীমিত সামরিক অভিযান যথেষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য নেওয়া হয়, তাহলে ব্যাপক স্থল সেনা অভিযান পরিচালনা করতে হবে অথবা ইরানের ভেতরে বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান ঘটতে হবে। কিন্তু বর্তমানে ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এমন কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে দ্রুত শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মনে করা হচ্ছে।


সূত্রটি আরও জানিয়েছে, চলমান সংঘাত নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের মূল্যায়নের মধ্যে বেশ বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসন গভীরভাবে চিন্তিত। অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করছে, তাদের সামরিক অভিযান উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে এবং তারা তাদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের পথে রয়েছে।


এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম Politico এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসন ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার আগে এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করেনি। ফলে সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড পরিমাণ তেল উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালনে প্রায় ৬০ সেন্ট পর্যন্ত বেড়ে গেছে।


এই দামবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে একটি ‘সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।


বাজারের উদ্বেগ কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে বাজারে সরবরাহ বাড়ে এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমে। তবে এর আগেও মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তার বক্তব্য বাজারকে তেমনভাবে আশ্বস্ত করতে পারেনি।


সব মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এই সংঘাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আগে থেকে পর্যাপ্ত মূল্যায়ন না করা এবং পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো এখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

Next Post Previous Post

মন্তব্য করুন