আমেরিকায় হামলার লক্ষ্যে ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে পাকিস্তান!মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা
পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অন্যতম বড় পারমাণবিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ২০২৬ সালের বার্ষিক বৈশ্বিক হুমকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয়েছে—ইসলামাবাদ এমন ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম তৈরির সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) মার্কিন সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির সামনে সাক্ষ্য প্রদানকালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান Tulsi Gabbard এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং পাকিস্তান—এই পাঁচটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পারমাণবিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার ভাষ্যমতে, এসব দেশ উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে তাদের সামরিক সক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গ্যাবার্ড তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই দেশগুলো এমন ধরনের অস্ত্র তৈরি করছে যা পারমাণবিক কিংবা প্রচলিত বিস্ফোরক বহনে সক্ষম এবং সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তিনি বিশেষভাবে চীন ও রাশিয়ার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, তারা এমন সব উন্নত ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে বা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, দেশটি ইতোমধ্যে এমন আইসিবিএম তৈরি করেছে যা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে এবং তারা তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডার আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি উদ্বেগজনক বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পাকিস্তান প্রসঙ্গে গ্যাবার্ড বলেন, ইসলামাবাদ তাদের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন একটি আইসিবিএম তৈরি করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি, তবুও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিকে নিয়েও নতুন করে কৌশলগত বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
এদিকে গ্যাবার্ড তার সাক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর হুমকির বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি Al-Qaeda এবং ISIS-কে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি স্বার্থের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার মতে, এসব সংগঠন এখনও সক্রিয় এবং সুযোগ পেলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে।
গোয়েন্দা প্রধান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা আগামী দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। তার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যেখানে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার হতে পারে, সেখানে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ১৬ হাজারে পৌঁছাতে পারে। এই প্রবণতা বিশ্বব্যাপী অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরান ইস্যুতেও গ্যাবার্ড গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর অবস্থানের সঙ্গে কিছুটা ভিন্নতা তৈরি করেছে। তিনি জানান, ২০২৫ সালের জুনে পরিচালিত কথিত মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর ফলে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং এরপর থেকে তারা সেই সক্ষমতা পুনর্গঠনের কোনো সুস্পষ্ট চেষ্টা করেনি।
তার লিখিত সাক্ষ্যে গ্যাবার্ড উল্লেখ করেন যে, ওই অভিযানের ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যত ভেঙে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে সেটি পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যায়নি। এই মন্তব্য কিছুটা বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, কারণ পূর্বে এ বিষয়ে ভিন্নমতও প্রকাশ পেয়েছিল।
শুনানির আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গণমাধ্যমকে জানান, গ্যাবার্ডের ওপর প্রেসিডেন্টের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। একই সময়ে ন্যাশনাল কাউন্টারটেরোরিজম সেন্টারের পরিচালক জোসেফ কেন্টের পদত্যাগের ঘটনাও এই শুনানিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বশেষ হুমকি মূল্যায়ন বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি জটিল ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: এনডিটিভি।
